ভারী বৃষ্টিতে তিউনিসে বন্যা, জনজীবন বিপর্যস্ত

অনলাইন ডেস্ক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন

আন্তর্জাতিক

ভারী বৃষ্টিতে তিউনিসে বন্যা, জনজীবন বিপর্যস্ত


আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারী বৃষ্টিতে তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসের বিভিন্ন এলাকা বৃহস্পতিবার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যায়, পানিতে আটকে পড়ে বহু গাড়ি। বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বৃহত্তর তিউনিস অঞ্চল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার বন্যার কবলে পড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বৃহস্পতিবারের বৃষ্টির আগে আবহাওয়া সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে তিউনিসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার অল্প সময় আগে জানানো হয়। বৃষ্টি বাড়তে থাকায় অভিভাবকেরা দ্রুত সন্তানদের স্কুল থেকে নিতে ছুটে যান। একই সময়ে রাজধানীর সড়কগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, রাস্তায় হাঁটুপানি জমে গেছে। পানিতে আটকে থাকা গাড়িগুলো সরানো যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের তারে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। বাসিন্দারা বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়িতে পানি ঢোকার কথাও জানিয়েছেন।

অল্প সময়েই বদলে যায় পরিস্থিতি
তিউনিসের ৩৫ বছর বয়সী কর্মজীবী ফাতমা বলেন, বিকেল ৪টার দিকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। বাব সাদুনের দিকে যাওয়ার একটি সড়কের নিচের পথ বৃষ্টির পানিতে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

তাঁর ভাষ্য, রাস্তার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ আটকে ছিলেন। গণপরিবহনের অপেক্ষায় থেকেও অনেকে কোনো যানবাহন পাননি। কয়েকটি গাড়িতে পানি ঢুকে সেগুলো বিকল হয়ে যায়। সন্তানদের কাঁধে তুলে পানি পার হতে দেখা গেছে অভিভাবকদের।

ফাতমা বলেন, প্রতি বর্ষায় একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সড়ক বন্ধ হয়ে যায়, যান চলাচল থেমে যায় এবং নালাগুলো আবর্জনায় আটকে পানি উপচে পড়ে।

দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার স্থানীয়ভাবে ভারী বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা, যান চলাচলে বিঘ্ন এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। সম্ভাব্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কথাও জানানো হয়।

পানি নিষ্কাশন নিয়ে প্রশ্ন
তিউনিসের লাফায়েত এলাকার ৩৩ বছর বয়সী বাসিন্দা ইনতিসার বলেন, বন্যা এখন যেন তিউনিসিয়ার নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতেও প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।

বর্ষা শুরুর আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কাজ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, পানি নিষ্কাশনের নালা ও অন্যান্য অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার বর্ষার আগেই শেষ করা উচিত ছিল।

তবে বাসিন্দাদেরও দায় আছে বলে স্বীকার করেন ইনতিসার। তাঁর মতে, অনেকে যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলেন। সেই আবর্জনা নালার মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না।

গত আগস্টে সরকারি এক বৈঠকে দেশজুড়ে পানি নিষ্কাশনের নালা ও জলপথ পরিষ্কার করার পাশাপাশি বন্যা প্রতিরোধের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার জানিয়েছে, সারা দেশে বন্যা প্রতিরোধে ২৯টি প্রকল্পের কাজ চলছে।

বৃষ্টির মধ্যে শনিবার সমাবেশ
বন্যার মধ্যেই শনিবার রাজধানী তিউনিসে একটি জাতীয় পদযাত্রার প্রস্তুতি চলছে। আয়োজকেরা আল-সুমুদ নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আটক চার কর্মীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

শনিবার বিকেল ৫টায় এই পদযাত্রা হওয়ার কথা। ওই দিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।

গাড়িনির্ভরতা বাড়ছে
বারবার বন্যা এবং নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের অভাব মানুষের দৈনন্দিন চলাচল আরও কঠিন করে তুলছে বলে মনে করেন ফাতমা। তাঁর মতে, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, গণপরিবহন ও সড়কব্যবস্থার এমন পরিস্থিতিতে গাড়ি ছাড়া চলাফেরা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এদিকে চলতি সপ্তাহেই তিউনিসিয়ায় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। ফলে সড়ক ও গণপরিবহনে এমনিতেই চাপ বেড়েছে। তার সঙ্গে বন্যা যুক্ত হওয়ায় রাজধানীর যান চলাচল আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

প্রতিবার বৃষ্টির পর একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। তাঁদের আশঙ্কা, পানি নিষ্কাশন ও বন্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নিলে তিউনিসে সামান্য ভারী বৃষ্টিও বড় ধরনের জনদুর্ভোগ তৈরি করতে থাকবে।
সূত্র: আলজাজিরা