ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা, সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের
ছবি-সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র আবারও দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা ওমানের রাজধানী মাসকাটে গত সপ্তাহান্তে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন তিনটি সূত্র।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মোখার আশপাশে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বাহিনী মারিবের উত্তরে হুথিদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। হুথিরা পাল্টা দাবি করেছে, মারিবের আকাশে তারা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
সৌদি আরব এখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। দুটি সূত্রের বরাতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর দ্রুত কমে আসছে। এ কারণে সৌদি আরব ফ্রান্স, পাকিস্তান, মিসর ও যুক্তরাজ্যের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে। তাদের অনুরোধের মধ্যে এসব দেশের পক্ষ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের বিষয়টিও রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রধান মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে নিজেদের ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়ার মুখে রয়েছে বলে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফলে রিয়াদের প্রতিরক্ষা চাহিদার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ওপর আগের মতো নির্ভরতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য কূটনৈতিক ও সামরিক-দুই দিকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স আল জাজিরাকে বলেন, হুথি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র “ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে। তাঁর ভাষ্য, সৌদি অংশীদারদের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের “সামরিক সম্পর্ক” রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারই প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যেই হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের খবর সামনে এসেছে। রয়টার্সের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। ওমান সরকার এ আলোচনায় সহায়তা করে।
বৈঠকে হুথি প্রতিনিধিরা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানান, তারা মার্কিন জাহাজে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা রাখে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি তারা মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানায়। তবে এসব তথ্য প্রকাশ করেছেন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা সূত্রগুলো।
অন্যদিকে ইয়েমেনবিষয়ক শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক নিল হপ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জুবাকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের “দৃঢ় সমর্থন” অব্যাহত থাকবে। ইয়েমেনে মার্কিন দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হপের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, “ইরান-সমর্থিত হুথিদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন সরকার ও দেশটির জনগণের পাশে রয়েছে।”
মাঠে অবশ্য সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। ইয়েমেনের সরকারি সেনাবাহিনী বলেছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মোখার আশপাশে হুথিদের ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পৃথক এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে সরকারি বাহিনী জানায়, উত্তর মারিব প্রদেশে হুথিদের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলাও চালানো হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমান তাইজ, মারিব ও হোদেইদা প্রদেশে ৪০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবুর একটি তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে সংগঠনটির এক বিবৃতিতে জানানো হয়।
মারিবের আকাশে সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেছে হুথিরা। তাদের বক্তব্য, একটি “স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র” ব্যবহার করে বিমানটি নামানো হয়েছে।
হুথি সামরিক গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে যোদ্ধাদের একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওটি ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, ছবিতে বিমানটির লেজে সৌদি আরবের পতাকা দেখা গেছে এবং বিভিন্ন দৃশ্যে ধ্বংসাবশেষের ক্ষতি ও রঙের পরিবর্তন একই রকম। তবে ভিডিওটির সঠিক স্থান ও ধারণের তারিখ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ১৬ সেপ্টেম্বরের আগে একই ভিডিওর পুরোনো কোনো সংস্করণও পাওয়া যায়নি। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ধ্বংস হওয়া বিমানটির মডেলও তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ইয়েমেনের আল জাজিরা প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি বলেছেন, সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার দাবি সত্য হলে তা সংঘাতের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তাঁর মতে, ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতার ওপর সৌদি আরব অনেকটাই নির্ভরশীল।
এদিকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একদিকে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
সূত্র: আলজাজিরা