হরমুজ ছাড়িয়ে মার্কিন অবরোধের খরচ বাড়াতে ইরানের পাল্টা চাপ

অনলাইন ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক

হরমুজ ছাড়িয়ে মার্কিন অবরোধের খরচ বাড়াতে ইরানের পাল্টা চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মার্কিন নৌ অবরোধের পাল্টা চাপ তৈরি করতে সামুদ্রিক সংঘাত আরও বিস্তৃত করছে ইরান। মার্কিন হামলায় ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেহরান হরমুজ প্রণালির বাইরেও জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ বুধবার বলেছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা অবরোধের প্রচলিত কৌশল বদলে দিচ্ছে। তাদের ভাষ্য, মার্কিন অবরোধের লক্ষ্য ছিল ইরানের রপ্তানি পথ সীমিত করে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতায় আঘাত করা। কিন্তু এখন দুই পক্ষই ট্যাংকার ও সামরিক জাহাজে হামলা চালানোয় অবরোধের অর্থনৈতিক বোঝা শুধু ইরানের ওপর থাকছে না।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, পাঁচটি ইরানি ট্যাংকারে মার্কিন হামলার জবাবে তারা দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, আটটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করা ১০টি ‘লঙ্ঘনকারী জাহাজ’ লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। তবে মার্কিন পক্ষ তাদের যুদ্ধজাহাজে হামলার দাবি অস্বীকার করেছে।

সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি

হরমুজের গণ্ডি ছাড়িয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি জানান, চাবাহারের দিক থেকে ওমান উপসাগরের কিছু অংশ এবং আরব সাগর হয়ে হরমুজের দিকে যাওয়া নৌপথ পর্যন্ত নতুন একটি নিষিদ্ধ এলাকা নির্ধারণ করা হবে। তবে এর সুনির্দিষ্ট সীমানা এখনো জানানো হয়নি।

কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর ও নোঙর এলাকায় থাকা ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজকেও সরে যেতে সতর্ক করেছে আইআরজিসি। মোহেব্বি বলেন, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ ওই এলাকায় ঢুকলে সেটিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময়ও ওই জাহাজকে সামুদ্রিক, বিমা ও অন্যান্য সেবা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী আমির চিজারি আরও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে-এমন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দর ব্যবহারে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘মাথার বদলে মাথা, চোখের বদলে চোখ’-অর্থাৎ এসব বন্দর ইরান অবরোধ করবে।

নূর নিউজ বলেছে, নতুন নিষিদ্ধ এলাকা তৈরির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সংঘাতের কৌশল বদলে দেওয়া। তাদের ভাষ্য, কোনো জাহাজ দখল না করেও তার চলাচল বা সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের খরচ এতটা বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আগেই পিছু হটে।

কূটনীতির পথও সংকুচিত

এদিকে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে এবং ইসলামাবাদ সমঝোতা কার্যকর হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার পথ তৈরি হতে পারে।

তবে মিডল ইস্ট আই বুধবার ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বার্তা দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন আগের সমঝোতায় ফিরবে না।

কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে ইরানের সামুদ্রিক কৌশলের ঝুঁকিও বাড়বে। তেহরানের হিসাব হলো, অবরোধের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র, বাণিজ্যিক জাহাজ ও আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর ছড়িয়ে দিতে পারলে শেষ পর্যন্ত অবরোধ শিথিল করার জন্য চাপ তৈরি হবে।

ইরানের জন্যও বাড়ছে ঝুঁকি

তবে ইরানের ভেতরেই এই কৌশলের সমালোচনা রয়েছে। রক্ষণশীল রাজনীতিক ও পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হেশমতোল্লাহ ফালাহাতপিশেহ সতর্ক করে বলেছেন, এমন পদক্ষেপ ইরানের নিজস্ব ট্যাংকার বহরকে বিপদের মুখে ফেলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাংকার কোম্পানি। তাঁর অভিযোগ, দেশটির বিপুল সম্পদকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে এবং এই ‘ইরান পোড়ানোর’ নীতি বন্ধ হওয়া দরকার।

তবে ইরানের কট্টরপন্থীরা বলছেন, দেশটি অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়েছে বলে মনে করলে অর্থনৈতিক হিসাবকে একমাত্র বিবেচনা করা যায় না। তাদের প্রশ্ন, এখন আপস করলে শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে-এর নিশ্চয়তা কী? কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালাবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?

সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বুধবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল চলাচল করলেও তা কমে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে।

ইরানের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম ২৩ লাখ ৩০ হাজার রিয়ালের ওপরে উঠে জাতীয় মুদ্রার আরেকটি রেকর্ড দরপতন হয়েছে।

হরমুজ প্রণালির বাইরে সংঘাতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় ছড়িয়ে দিয়ে মার্কিন অবরোধকে টেকসই করা কঠিন করে তোলাই তেহরানের কৌশল। কিন্তু সংঘাত যত দূর পর্যন্ত হরমুজের বাইরে ছড়াবে, সেই চাপ শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপরই ফিরে আসার ঝুঁকিও তত বাড়বে।